মূল গল্পে যাওয়ার আগে আমার কৈশোরের একটা স্বপ্নের গল্প বলে নিই।
স্কুলের শেষদিক থেকে কলেজের দুই বছর আমি নিয়মিত ক্রিকেট খেলতাম। স্কুলের টিম, কলেজের টিম, সেকেন্ড ডিভিশন, পাড়ার টিম, খ্যাপ – কিছুই বাদ রাখতাম না।
তখন মাঝেমাঝেই একটা স্বপ্ন দেখতাম; রিকারিং ড্রিম যাকে বলে। আমি ব্যাট করতে নেমেছি, বল হাতে রেডি ওয়াসিম আকরাম!

স্বপ্নটা কিছুদিন পরপরই ফিরে ফিরে আসতো। প্রতিবার বোলার কিন্তু ঐ একজনই – ওয়াসিম আকরাম। কারণটা মনে হয় আমি জানতাম। আমার কাছে তখন (এবং এখনো) ওয়াসিম আকরামকেই পৃথিবীর ভয়ংকরতম বোলার মনে হতো।
স্বপ্নের শুরুটা এক রকম হলেও পরবর্তীতে স্বপ্ন নানাদিকে প্রবাহিত হতো। কোন কোন স্বপ্নে আমি নার্ভাস, প্রথম বলেই আউট; আবার কোন কোন দিন আমি চার ছয় মেরে একাকার।
খুব ইচ্ছা ছিল যদি কখনো সামনা সামনি দেখা হয়, স্বপ্নের কথাটা তাঁকে জানাবো।
দেখা হয়নি তাঁর সাথে কখনো। তাই স্বপ্নের কথা জানানোর স্বপ্নটা স্বপ্নই রয়ে গেলো।
—-
এবার WCA’র গল্পে আসি।
WCA’র ফুল ফ্রম হল World Cube Association. FIFA যেমন ফুটবলের, ICC যেমন ক্রিকেটের, WCA হল কিউবিং’এর হর্তাকর্তা সংগঠন। বিশ্বব্যাপী কিউবিং’কে জনপ্রিয় করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে WCA’র লোকজন।সহজভাবে বললে, WCA’র স্বীকৃতি ছাড়া কোন কিউবিং প্রতিযোগিতার তেমন কোন দাম-ভাও নাই।
কিউবিং ব্যাপারটা যারা জানেন না, তাদের জন্য বলছি। রুবিক্স কিউবের নাম হয়তো শুনেছেন। ফাস্ট কিউবিং প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীরা দ্রুততম সময়ে রুবিক্স কিউব মিলানোর চেষ্টা করে। যে সবচেয়ে কম সময়ে কিউব মিলাতে পারবে সে জিতবে।
সাধারণ কয়েক ধাপে একটা টুর্নামেন্ট হয় – প্রথম রাউন্ড, দ্বিতীয় রাউন্ড, ফাইনাল ইত্যাদি। একেক রাউন্ডে প্রতি প্রতিযোগীকে সাধারণত ৫ বার করে কিউব মিলাতে হয়। এই ৫ বারের টাইমিং গড় করে প্রতিযোগীর টাইমিং নির্ধারণ করা হয়।
একটা টুর্নামেন্টে নানারকম কিউবের কম্পিটিশন হয়; 3X3 (এটা সবচেয়ে কমন), 2X2, 4X4, 5X5, 6X6, 7X7, 3X3 blindfolded মানে চোখ বেঁধে, 3X3 one-handed মানে এক হাতে; ইত্যাদি ইত্যাদি।

বছর জুড়ে পৃথিবীর নানা দেশে, নানা শহরে WCA’র প্রতিযোগিতা চলতেই থাকে। কিছু ন্যাশনাল, কিছু ইন্টারন্যাশনাল। আমার ছেলে জীয়ন গত সপ্তাহে তার প্রথম WCA টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করে।
জীয়নের বয়স ১১। বছরখানেক ধরে ওর কিউবিং-এর প্রতি আগ্রহ। স্কুলে কয়েকজন বন্ধু মিলে ও কিউব মিলায়। নিয়মিত প্র্যাকটিস করে এখন সে বেশ দ্রুতই কিউব মিলাতে পারে।

এটা ছিল টরন্টোতে একটা রিজিয়নাল কম্পিটিশন। ১২০ জন প্রতিযোগী। প্রথম রাউন্ড শেষে টপ ৭৫% দ্বিতীয় রাউন্ডে যাবে। দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে টপ ১২ জন ফাইনালে।
জীয়নের প্রাথমিক লক্ষ্য টপ ৭৫%-এ থাকা। তাহলেই ও খুশি। আমি আর জীয়নের মা এমনিতেই খুশি। ছেলেকে নিয়ে একটা নতুন জায়গাতে এসেছি, এই তো অনেক 🙂
প্রথম রাউন্ডে জীয়নের গড় টাইমিং হল ২১.৩০ সেকেন্ড। বাসায় ওর গড় ১৮-১৯শের ঘরে থাকে। জীয়নের একটু মন খারাপ তাই। ওকে বুঝালাম, এতো বড় টুর্নামেন্ট, ওর জন্য তো সবই নতুন। কম্পিটিশনের টেনশনে কিছুটা স্লো তো হতেই পারে।

দ্বিতীয় রাউন্ডের ঘটনা। জীয়নের তখনো ডাক আসেনি। আমরা অন্যদের কিউব মিলানো দেখছি। সব মিলিয়ে ১২টা টেবিল। একেক টেবিলে একেকজন প্রতিযোগী কিউব মিলাচ্ছে। হঠাৎ শুনি হৈহৈ শব্দ।
ডান দিকের একদম কোণের টেবিলে একজন প্রতিযোগী ৪.৪২ সেকেন্ডে সলভ করে ফেলেছে! ওরে, সে কী হুলুস্থুল ব্যাপার! জানতে পারলাম ৪.৪২ সেকেন্ড নাকি ক্যানাডার তৃতীয় দ্রুততম সলভ!
জীয়ন এক দৌড়ে ঐ টেবিলে চলে গেলো। আমরাও তার পিছন পিছন দৌড়। সবাই ঘিরে ধরেছে ঐ প্রতিযোগীকে। জীয়ন চোখে মুখে মুগ্ধতা ৪.৪২ সেকেন্ড-ওয়ালার দিকে তাকিয়ে আছে।
“বাবা, তুমি জানো ও কে? ও হল মরগান ইয়েহ। ক্যানাডার নাম্বার টু। ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্ক ২৪! হি ইজ আ লেজেন্ড! আমি তো এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে, আমি ওকে সামনে থেকে দেখছি! জানো, আমি ওকে বলেছি – ওয়েল ডান! আর ও আমাকে বলেছে – থ্যাংক ইউ বাডি!”
বুঝলাম, আমার ছেলে তার ওয়াসিম আকরামের সাথে এইমাত্র কথা বলে ফেললো!
টপ ৭৫% এর মধ্যে থেকে জীয়ন দ্বিতীয় রাউন্ডে গেলো। জীয়নের পজিশন ২২তম।
দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে জীয়নের মধ্যে আর কোন টেনশন দেখলাম না। খুবই ভালো করলো ও এই রাউন্ডে। ১৭.৬০ সেকেন্ড গড় নিয়ে ও সবাইকে (এবং নিজেকেও) অবাক করে দিয়ে ফাইনালে উঠে গেলো!
ফাইনালের ১২ জনের মধ্যে জীয়নই একমাত্র নিউকামার। বয়সেও বাকিদের থেকে ও অনেক ছোট। তাই হয়তো সবাই এসে ওকে বেশ বাহবা দিয়ে যাচ্ছিল!
ফাইনাল রাউন্ডে ১২ জন যার যার টেবিলে রেডি। এমন কপাল; জীয়নের পাশের টেবিলে মরগান ইয়েহ। জীয়নকে দেখে মনে হল যেন তব্দা খেয়ে গেছে।
মরগানের বয়স ২০এর কাছাকাছি। হাসিখুশি একটা ছেলে। জীয়নের সাথে নিজে থেকেই কথা শুরু করলো। “ওয়াও! তুমিই তাহলে সেই নিউকামার ফাইনালিস্ট? খুব ভালো টাইমিং কিন্তু তোমার! আরও প্র্যাকটিস করো। খুব তাড়াতাড়ি তুমি আমাকে ছাড়িয়ে যাবে!”
বুঝতে পারছেন তো ব্যাপারটা? যেন ওয়াসিম আকরাম আমাকে বলছে, “রাজীব, তুমি কিন্তু অনেক ভালো ব্যাটসম্যান! ভালমতো প্র্যাকটিস করলে তুমি টেনডুলকারকেও ছাড়িয়ে যাবে!”
জীয়ন ১২জনের মধ্যে দ্বাদশ হয়ে ফাইনাল শেষ করলো। তবে ওর টাইমিং আরও ভালো হল। একটা সলভ ছিল ১৫.৭৮ সেকেন্ড, যা এখন পর্যন্ত ওর বেস্ট টাইমিং। মরগান ৫.৪৮ সেকেন্ড গড় টাইমিং নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলো।
এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করে জীয়ন WCA’র র্যাঙ্কিং সিস্টেমেও ঢুকে গেলো। এখন ওর ক্যানাডিয়ান র্যাঙ্কিং ১৫৯৭, ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিং ৪৭১০৫। যত বেশি টুর্নামেন্ট খেলবে, র্যাঙ্কিং ধীরে ধীরে আরও উপরের দিকে ওঠার সুযোগ থাকবে।
গত এক সপ্তাহে মরগানের কথার এফেক্ট দেখে কিন্তু আমরা মুগ্ধ। জীয়ন এখন প্রতিদিন নিয়ম করে আরও সিরিসালি প্র্যাকটিস করছে। গুগল থেকে মরগানের একটা ছবি নামিয়ে, প্রিন্ট করে দেখি দেয়ালেও লাগিয়ে রেখেছে।

জুনে ওয়াটারলু’তে আরেকটা টুর্নামেন্ট। জীয়ন জানালো, ওয়াটারলু’র কম্পিটিশনে ব্রেনান লিন থাকবে। ও ক্যানাডার নাম্বার ওয়ান, ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্ক ১৬।
ঐ কম্পিটিশনে জীয়ন 3X3’এর পাশাপাশি 2X2’তেও অংশগ্রহণ করবে। 2X2 এখন জীয়ন ৫-৬ সেকেন্ডে সলভ করে। আমি, যে কিনা জীবনে একবারও একটা রুবিক্স কিউব মিলাতে পারিনি, তার কাছে স্বাভাবিকভাবেই ৫-৬ সেকেন্ডকে ভীষণ ফাস্ট বলেই মনে হয়!
“তুই তো 2X2’তে অনেক ফাস্ট! কি মনে হয়? পারবি ফাইনাল পর্যন্ত যেতে?”
“বাবা! তোমার কোন ধারণা আছি তুমি কি বলছো? তুমি কি জানো ব্রেনান লিন’এর ফাস্টেস্ট সলভ কতো? He has a 0.61 seceond solve! He is lighting fast!”
জীয়নের চোখে-মুখে আলোর ঝলকানি দেখি আমি। WCA আসলেই অসাধারণ একটা ব্যাপার। আমি ভীষণ খুশি জীয়নের খুশি দেখে।
এতো কথা কেন বললাম জানেন? যদি আপনাদের বাচ্চাও কিউবিং’এ আগ্রহী হয়, প্লিজ ওকে উৎসাহ দিবেন। কিউবিং’এর অনেক উপকারিতা। কিউবাররা সাধারণত অংক, কোডিং, লজিক অনেক সহজে বুঝে ফেলতে পারে। তাছাড়া এই মোবাইল-ইন্টারনেটের ভারচুয়াল পৃথিবীতে বাচ্চারা রক্তমাংসের পৃথিবীর কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত – দেখতেও তো কেমন শান্তি শান্তি লাগে।



Leave a reply